এস এম নাসির উদ্দিন,বিশেষ সম্পাদকীয় # সাংবাদিকতা পেশা ছিল একসময় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সততা ও সাহসের প্রতীক। কিন্তু মফস্বল সাংবাদিকতায় আজ যে বাস্তবতা দৃশ্যমান তা দুঃখজনক ও চিন্তার বিষয়। কুলি, দিনমজুর, গরুর দালাল, থানার দালাল কিংবা জমির দালাল—অশিক্ষিত ও অদক্ষ মানুষরাও আজ সহজেই নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছে। সমাজে এর প্রভাব পড়ছে গভীরভাবে, আর সাংবাদিকতার মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন।সিনিয়রদের দায়#এক্ষেত্রে দায় কেবল অশিক্ষিতদের নয়, বরং সিনিয়র ও শিক্ষিত সাংবাদিকদেরও। অনেক সিনিয়র নিজেদের দল ভারী করার জন্য, কিংবা প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে অশিক্ষিতদের দলে টেনে নেয়। তাদের শিষ্য বানিয়ে নিজেকে ‘গুরু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এতে সাংবাদিকতার মান রক্ষার পরিবর্তে ধান্দাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলস্বরূপ, মফস্বল সাংবাদিকতায় প্রকৃত সাংবাদিকরা সংখ্যায় কমে আসছে।#ভুঁইফোড় টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালগুলো এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। প্রথম সারির টিভি চ্যানেল যেখানে একটি জেলায় একজন প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়, সেখানে এসব ভুঁইফোড় চ্যানেল একই জেলায় একাধিক জেলা প্রতিনিধি, উপজেলা প্রতিনিধি, ক্রাইম প্রতিনিধি, ব্যুরো প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে। তারা বিনা পয়সায় এসব নিয়োগ দেয় না; বরং নিয়োগপত্রের আড়ালে চলে টাকার লেনদেন। আর বেতন-ভাতা দেওয়ার ঝামেলা নেই, শুধু পরিচয়পত্র ধরিয়ে দিয়ে বলে দেওয়া হয়—“নিজের খরচ নিজেই তুলো।” এভাবেই অশিক্ষিতদের হাতে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র চলে যাচ্ছে।বাস্তব উদাহরণএমনকি গ্রামে বসে এক তরুণও ভাবে—কিছু টাকা দিয়ে যদি একটি আইডি কার্ড বানানো যায়, তবে সেও সাংবাদিক! অথচ কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ কিংবা পেশাগত দক্ষতা ছাড়াই সে মাঠে নেমে যায়। এতে একদিকে সমাজ বিভ্রান্ত হয়, অন্যদিকে প্রকৃত সাংবাদিকদের কষ্টার্জিত মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।করণীয়এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে—১. সিনিয়র সাংবাদিকদের ভূমিকা: ব্যক্তিগত স্বার্থে অশিক্ষিতদের দলে টেনে আনা বন্ধ করতে হবে।২. সংগঠনগুলোর ঐক্য: প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিপোর্টার্স ইউনিটি—সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভুঁইফোড় নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।৩. কঠোর নীতিমালা: মিডিয়া মালিকদের উচিত হবে নিয়োগে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।৪. সচেতনতা: তরুণদের জানাতে হবে সাংবাদিকতা কোনো ‘কার্ডের খেলা’ নয়, এটি এক কঠিন ও জবাবদিহিমূলক পেশা।উপসংহারযদি এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে শঙ্কা থেকেই যায়—একদিন মফস্বল সাংবাদিকতা প্রকৃত সাংবাদিকদের হাত থেকে সরে গিয়ে দালাল ও অশিক্ষিতদের কব্জায় চলে যাবে। তখন সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে, আর পেশার মর্যাদাও হারাবে। তাই সাংবাদিকতা পেশাকে অশিক্ষিতদের হাত থেকে রক্ষায় এখনই সবার একসাথে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।